ঝিঙে ফুল
কাজী নজরুল ইসলাম
ঝিঙে ফুল! ঝিঙে ফুল!
সবুজ পাতার দেশে ফিরোজিয়া ফিঙে-কুল- ঝিঙে ফুল।
গুলে পর্ণে
লতিকার কর্ণে
ঢলঢল স্বর্ণে
ঝলমল দোলো দুল- ঝিঙে ফুল ॥
পাতার দেশের পাখি বাঁধা হিয়া বোঁটাতে, গান তব শুনি সাঁঝে তব ফুটে ওঠাতে।
পউষের বেলাশেষ
পরি জাফরানি বেশ
মরা মাচানের দেশ
করে তোলো মঞ্জুল- ঝিঙে ফুল ॥
শ্যামলী মায়ের কোলে সোনামুখ খুকু রে, আলুথালু ঘুমু যাও রোদে গলা দুপুরে।
প্রজাপতি ডেকে যায়-
‘বোঁটা ছিঁড়ে চলে আয়!’
আসমানে তারা চায়-
‘চলে আয় এ অকূল!’ ঝিঙে ফুল ॥
তুমি বলো-'আমি হায়
ভালোবাসি মাটি-মা'য়,
চাই না ও অলকায়-
ভালো এই পথ-ভুল!' ঝিঙে ফুল ॥
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
তাল গাছ এক পায়ে দাড়িয়ে, সবগাছ ছাড়িয়ে
উঁকি মারে আকাশে
মনে হয় কালোমেঘ ফুড়ে যায়, একেবারে উড়ে যায়
কোথা পাবে পাখা সে?
ঝিঙে ফুল - ঝিঙে সবজির ফুল।
ফিরোজিয়া - ফিরোজা রঙের।
গুলে পর্ণে - ঝোপঝাড়ে ও পাতায়।
লতিকার কর্ণে - লতার কানে।
হিয়া - হৃদয়।
সাঁঝে - সন্ধ্যায়।
পউষের - পৌষ মাসের।
পরি - পরিধান করে।
জাফরানি - জাফরান রঙের।
মাচান - মাচা। পাটাতন।
আলুথালু - এলোমেলো।
মশগুল - বিভোর। মগ্ন।
অকূল - কূল বা তীর বিহীন। সীমাহীন।
অলকা - স্বর্গের নাম। হিন্দু ধর্মের ধন-দৌলতের দেবতা কুবেরের আবাসস্থল।
কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও প্রকৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ ছিল গভীর। 'ঝিঙে ফুল' কবিতায় কবির এই প্রকৃতিপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। আমাদের অতি পরিচিত ঝিঙে ফুলকে উদ্দেশ্য করে তিনি এ কবিতাটি লিখেছেন। পৌষের বেলাশেষে সবুজ পাতার এ দেশে জাফরান রং নিয়ে ঝিঙে ফুল মাচার উপর ফুটে আছে। তাকে বোঁটা ছিঁড়ে চলে আসার জন্য প্রজাপতি ডাকছে। আকাশে চলে যাওয়ার জন্য তারা ডাকলেও ঝিঙে ফুল মাটিকে ভালোবেসে মাটি-মায়ের কাছেই থাকবে। এ কবিতায় প্রকৃতির প্রতি কবির ভালোবাসা একটি ঝিঙে ফুলকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহের কবি, প্রেমের কবি, মানবতার কবি। অন্যায়, শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে উদ্দীপনামূলক কবিতা লিখে বাংলার জনমনে তিনি 'বিদ্রোহী কবি' হিসেবে নন্দিত আসন পেয়েছেন।
বহুবিচিত্র ও বিস্ময়কর তাঁর জীবন। ছেলেবেলায় লেটোর দলে গান করেছেন, বুটির দোকানের কারিগর হয়েছেন, যুদ্ধে যোগ দিয়ে সেনাবাহিনীর হাবিলদার হয়েছেন। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে কারাবরণ করেছেন, পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন।
বিস্ময়কর তাঁর সৃষ্টি। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, সংগীত ইত্যাদি রচনার মাধ্যমে যে জগৎ তিনি তৈরি করেছেন তা অভিনব। তিনি যে শুধু বড়োদের জন্য অনেক গ্রন্থ লিখেছেন তা নয়, ছোটদের জন্যও তিনি লিখেছেন অনেক কাব্য, গান, নাটক ও গল্প। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে: 'ঝিঙেফুল', 'পিলে পটকা', 'ঘুমজাগানো পাখি', 'ঘুমপাড়ানী মাসিপিসি' এবং নাটক হচ্ছে 'পুতুলের বিয়ে'।নজরুলের কবিতা ও গান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তাঁর লেখা গান 'চল্ চল্ চল্' আমাদের রণসংগীত। তিনি আমাদের জাতীয় কবি।
নজরুলের জন্ম ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে আগস্ট তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
১. ১৫টি ফুলের নাম লেখ। ফুলের রং, আকৃতি, পাপড়ি, গন্ধ ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য দাও।
Read more